বই রিভিউ ০১ঃ হামাস || ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের ভেতর বাহির
বই-রিভিউঃ-হামাস-ফিলিস্তিন-মুক্তি-আন্দোলনের-ভেতর-বাহির

বই রিভিউ ০১ঃ হামাস || ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের ভেতর বাহির

হামাস (ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের ভেতর বাহির) বই রিভিউ

১৯৪৮ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের মাধ্যমে ইজরাইল অবৈধভাবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। শুরু হয় ইজরাইলের উচ্ছেদ অভিযান।একদিকে ফিলিস্তিনের লাখ লাখ মানুষ নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে থাকে, অন্যদিকে ইজরাইল দখলকৃত অঞ্চলে নতুন বসতি গড়ে তোলে। এভাবে ১৯৫৬,১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধে ফলাফল হিসেবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উচ্ছেদ, হত্যা,নির্যাতন চলেছে, অন্যদিকে ইজরাইল প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনকে পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে থাকে।

ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমে ইখওয়ানুল নুসলিমীন বা মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এটি মিশরের ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফিলিস্তিনি জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।কারণ সংগঠনটি ফিলিস্তিনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষামূলক ব্যাপক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করে এবং এর থেকে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন হতে থাকে।আর এটির কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল না বলে ইজরাইল সরকারও অনুমোদন দেয়।কিন্তু সংগঠনটির বাহ্যিক কাজের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ একটি স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল।আর সেটি হলো ফিলিস্তিনকে দখলমুক্ত করা।এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন শেখ আহমাদ ইয়াসিন।তাদের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে ভিতরে ভিতরে নিজেদের প্রস্তুত করা এবং মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা করা।

এক নজরেঃ
বইয়ের নাম: হামাস (ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের ভেতর-বাহির)
লেখক: আলী আহমাদ মাবরুরপ্রকাশনী: গার্ডিয়ান পাবলিকেশনস
মুদ্রিত মূল্য : ৪৮০ টাকা।
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৬৫

সেরকম সুযোগ চলে আসে সংগঠনটির সামনে। ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনে প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হলে ব্যাপক গণজাগরণ শুরু হয়।তখন ফিলিস্তিন ইখওয়ানুল মুসলিমীন পরিবর্তিত হয়ে The Islamic Resistance Movement বা (আরবিতে) হামাস নামে আত্মপ্রকাশ করে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ আহমাদ ইয়াসিন। হামাসের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে ইন্তিফাদা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ১৯৮৭ সালে শুরু হয়ে প্রথম ইন্তিফাদা ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

তখন থেকেই শুরু হয় ইজরাইল বাহিনীর হামাসের উপর ব্যাপক নির্যাতন এবং গণগ্রেফতার। মূলত তখন থেকেই হামাস সক্রিয়ভাবে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। লেখক হামাসের সাথে ফাতাহর সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তুলে ধরেছেন তার মূল বক্তব্য হলো,ফাতাহ হলো ধর্মনিরপেক্ষ এবং তারা আলাপ আলোচনা শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ে বিশ্বাসী।  কিন্তু হামাস তার উল্টো। তারা একটি ইসলামিক সংগঠন এবং তাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ সংগ্রামের মাধ্যমে ইজরাইলকে উৎখাত করা।বলাবাহুল্য, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ মানুষই হামাসকে সমর্থন করেছে।কারণ তারা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে,ইজরাইল কখনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে না।

বইটিতে মূলত আলোচনা হয়েছে ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত।যদিও সমসাময়িক বিষয়ও কিছুটা আলোকপাত করেছেন লেখক। আলোচনার প্রতিটি অধ্যায়ে শেখ আহমাদ ইয়াসিন এর বিভিন্ন পদক্ষেপ, তার নেতৃত্বগুণ,সাংগঠনিক দক্ষতা, কারাজীবন,মুক্তি,হামাসের বিস্তার, রাজনৈতিক শাখা থেকে সামরিক শাখা,হামাস নেতাদের নেতৃত্ব ফুটে উঠেছে।

এছাড়া হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মোসাদের গুপ্ত হত্যা এবং গোয়েন্দা বাহিনীর গুপ্তচরদের মাধ্যমে ইজরাইল কিভাবে তথ্য উদ্ধার করে তারও আলোকপাত করেছেন। ইয়াসির আরাফাত প্রথমদিকে হামাসের বিরোধিতা করলেও শেষ জীবনে হামাসের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কারণ মাহমুদ আব্বাসের সাথে ইয়াসির আরাফাতের সম্পর্কের আদর্শিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
কাকতালীয় ব্যাপার হলেও সত্যি যে হামাস নেতা শেখ আহমাদ ইয়াসিন এবং পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত একই বছর ২০০৪ সালে ইজরাইল বাহিনী কর্তৃক শহীদ হন।শারীরিক প্রতিবন্ধী শেখ আহমাদ ইয়াসিন ফজরের নামাজের শেষে মসজিদ থেকে বের হলে ইজরাইল সেনারা রকেট হামলা করে তাকে সঙ্গীসহ হত্যা করে এবং একই বছর ইয়াসির আরাফাত অসুস্থ হয়ে ফ্রান্সের সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানে মৃত্যুবরণ করেন।তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে এবং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ইজরাইলকে দোষারোপ করে।

২০১২ সালে ইয়াসির আরাফাতের দেহাবশেষ নতুন করে পরীক্ষা করা হয় এবং সেখানে পলিনিয়াম নামক মারাত্মক বিষের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় ইয়াসির আরাফাতকে ইজরাইল বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। বইটির মাধ্যমে আরও জানা সম্ভব হবে তৎকালীন সময়ে মিশর,কুয়েত,জর্ডানের ফিলিস্তিন নীতি।জানা সম্ভব হবে ইজরাইলের কারাগারে বন্দীদের করুণ পরিণতি।  এক কথায় বইটি অনেক তথ্যবহুল। যারা হামাস এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তারা আশাকরি সন্তুষ্ট হবেন।হামাসের মূলনীতি, সংবিধান,লক্ষ্য বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্ব হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিলেও কিভাবে টিকে আছে তারও প্রমাণ পাওয়া যাবে।

 146 total views,  4 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *