মাহমুদুল্লাহ রিয়াদঃ বড় মঞ্চের নায়ক অথবা ক্রিকেট বাংলাদেশের আনসাং হিরো
মাহমুদুল্লাহ-রিয়াদঃ-বড়-মঞ্চের-নায়ক-অথবা-ক্রিকেট-বাংলাদেশের-আনসাং-হিরো

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদঃ বড় মঞ্চের নায়ক অথবা ক্রিকেট বাংলাদেশের আনসাং হিরো

বর্তমান টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ

“মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ” বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বর্তমান টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক। নিয়মিত অধিনায়ক “সাকিব আল হাসান” নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রথমে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করলেও এখন পাকাপোক্তভাবে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। যদিও পূর্বে বহুবার তিনি সহ-অধিনায়ক ছিলেন, অনেকবার দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফি, ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন সিনিয়র সদস্য।

মোহাম্মদ মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ১৯৮৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন । এই ডানহাতি অলরাউন্ডারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মাধ্যমে ২০০৭ সালের ২৫শে জুলাই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে। সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে তার অভিষেক ঘটে। অভিষেক ম্যাচে তিনি ৫ ওভার বোলিং করে ২৮ রানের বিনিময়ে ২টি উইকেট সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে ব্যাটিং করতে নেমে ৩৬ রানের একটি ইনিংস খেলে অভিষেক ম্যাচকে রাঙিয়ে তোলেন। তার ওডিআই ক্যাপ নং- ৮৫। তিনি তার সর্বশেষ ওডিআই ম্যাচ খেলেন ২০২০ সালের ৬ই মার্চ সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, ওই ম্যাচে তিনি ৪ বলে ৩ রান করেন।

এই কার্যকারী মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান তার টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে অভিষেক ঘটান ২০০৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর কেনিয়ার বিপক্ষে নাইরোবিতে। ওই ম্যাচে তিনি ৮ বলে ২ রান করেন এবং একটি ক্যাচ লুফে নেন। তার টি-টুয়েন্টি ক্যাপ নং- ১৩। তিনি তার ক্যারিয়ারের সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলেন ২০২০ সালের ১১ই মার্চ ঢাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে তিনি বল হাতে তুলে নেন নি, এবং বাংলাদেশ ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করায় ব্যাটিং করার সুযোগ পান নি।

এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান এবং ডানহাতি অফব্রেক বোলার তার ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেন ২০০৯ সালের ৯জুলাই কিংসটাউনে ওয়েস্টইন্ডিজের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে তিনি ব্যাট হাতে প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংসে যথাক্রমে ৯ ও ৮ রান করেন। পরবর্তীতে বল হাতে প্রথম ইনিংসে ৫৯ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৫১ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট শিকার করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এবং তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্ট অভিষেকে ৫ উইকেট নেয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার টেস্ট ক্যাপ নং- ৫৫। তিনি শেষ টেস্ট খেলেন রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০২০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি। ওই ম্যাচে তিনি প্রথম ইনিংসে ২৫ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ০ রান করেন।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বকাপে শতক হাঁকানোর কৃতিত্ব অর্জন করেন, একই সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে পরপর দুই ম্যাচে শতক হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন। তিনি তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্ট অভিষেকে পাঁচ উইকেট নেয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে ওডিআইতে চারহাজার রান করার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

এক নজরে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ   (ওয়ানডে ম্যাচ)

ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন- ১৮৮টি
ব্যাটিং করেছেন- ১৬৩ ইনিংসে
রান করেছেন – ৪০৭০
বল মোকাবেলা করেন- ৫৩১১ টি
গড় – ৩৩.৬৩
স্ট্রাইক রেট – ৭৬.৬৩
শতক – ৩ টি
অর্ধশতক – ২১ টি
নটআউট – ৪২ বার
চার মেরেছেন – ৩১৭ টি
ছক্কা হাঁকিয়েছেন – ৫৭ টি
ক্যাচ ধরেছেন – ৬৪ টি
সর্বোচ্চ রান- ১২৮* ( প্রতিপক্ষ- নিউজিল্যান্ড, বিশ্বকাপ- ২০১৫)
বোলিং করেছেন – ১৩৬ ইনিংস
বল করেছেন – ৪১৩২ টি
রান দিয়েছেন- ৩৫৬১ টি
উইকেট নিয়েছেন- ৭৬ টি
ইকোনমি – ৫.১৭
গড় – ৪৬.৮৫
স্ট্রাইক রেট – ৫৪.৩
পাচউইকেট – নেই
ম্যাচসেরা বোলিং- ৪ রানে ৩ উইকেট শিকার।

টেস্ট ম্যাচে  মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ 

টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন- ৪৯ টি
ব্যাটিং করেছেন- ৯৩ ইনিংসে
রান করেছেন – ২৭৬৪
বল মোকাবেলা করেন- ৫১৭৮ টি
গড় – ৩১.৭৭
স্ট্রাইক রেট – ৫৩.৩৭
শতক – ৪ টি
অর্ধশতক – ১৬ টি
নটআউট – ৬ বার
চার মেরেছেন – ৩২১ টি
ছক্কা হাঁকিয়েছেন – ২৩ টি
ক্যাচ ধরেছেন – ৩৮ টি
স্ট্যাম্পিং করেছেন- ১টি
সর্বোচ্চ রান- ১৪৬ ( প্রতিপক্ষ- নিউজিল্যান্ড , ২০১৯ সালে স্যাডন পার্কে)
বোলিং করেছেন – ৬৫ ইনিংস
বল করেছেন – ৩৩৯৯ টি
রান দিয়েছেন- ১৯৪৯ টি
উইকেট নিয়েছেন- ৪৩ টি
ইকোনমি – ৩.৪৪
গড় – ৪৫.৩২
স্ট্রাইক রেট – ৭৯.০
পাচউইকেট – ১বার
ইনিংসসেরা বোলিং- ৫/৫১ (অভিষেক ম্যাচে ওয়েস্টইন্ডিজের বিপক্ষে)
ম্যাচসেরা বোলিং- ৮/১১০ ( একই ম্যাচে)

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে

ম্যাচ খেলেছেন- ৮৭ টি
ব্যাটিং করেছেন- ৭৯ ইনিংসে
রান করেছেন – ১৪৭৫
বল মোকাবেলা করেন- ১২০১ টি
গড় – ২৪.১৮
স্ট্রাইক রেট – ১২২.৮১
শতক – নেই
অর্ধশতক – ৪ টি
নটআউট – ১৮ বার
চার মেরেছেন – ১১৭ টি
ছক্কা হাঁকিয়েছেন – ৪৮ টি
ক্যাচ ধরেছেন – ৩২ টি
সর্বোচ্চ রান- ৬৪
বোলিং করেছেন – ৫৫ ইনিংস
বল করেছেন – ৭১১ টি
রান দিয়েছেন- ৮৬৪ টি
উইকেট নিয়েছেন- ৩১ টি
ইকোনমি – ৭.২৯
গড় – ২৭.৮৭
স্ট্রাইক রেট – ২২.৯
পাচউইকেট – নেই
ম্যাচসেরা বোলিং- ৩/১৮

পাঁচফুট এগারো ইঞ্চির এই বাংলাদেশি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ওয়ানডে ক্রিকেটে শতক হাঁকিয়েছেন ৩ টি। তার এই ৩টি শতকই এসেছে আইসিসি ইভেন্টে। প্রথম শতক – তার প্রথম শতকটি আসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৫ বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে, ওই ম্যাচে তিনি ১০৩ রান করে ক্রিস ওকসের থ্রোতে রানআউট হন। বাংলাদেশ ম্যাচটি ১৫ রানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, এবং ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে তার হাতে। এই শতকের মাধ্যমে তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে শতক হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন।

দ্বিতীয় শতক – তার দ্বিতীয় শতক টি আসে ঠিক তার পরের ম্যাচে অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, ওই ম্যাচে তিনি ১২৮ রানে অপরাজিত থাকেন। যদিও বাংলাদেশ ম্যাচটি হেরে যায়। এই শতকের মাধ্যমে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে টানা দুটি শতক হাঁকানোর কৃতিত্ব অর্জন করেন।তৃতীয় শতক- তার তৃতীয় শতক আসে ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, ২৭৫ রানের টার্গেটে খেলতে নেমে ৩৪ রানে ৪ উইকেট পরে গেলে ক্রিজে আসেন রিয়াদ, ঐখান থেকে সাকিব আল হাসানের সাথে ২২৪ রানের জুটি গড়ে ৫ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন, ওই ম্যাচে তিনি ১০৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। ঐ জয়ের ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমি ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এর মোট টেস্ট শতক ৪ টি।
প্রথম শতক – ২০১০ সালে স্যাডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক তুলে নেন তিনি। ওই ম্যাচে সেকেন্ড ইনিংসে তিনি ১১৫ রান করেন।
দ্বিতীয় শতক– দ্বিতীয় শতক পেতে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে অপেক্ষা করতে হয় আট বছর। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশ সফর করতে এলে অধিনায়কত্ব করেন রিয়াদ, সিরিজের শেষ টেস্টে সেই আরাধ্য শতকের দেখা পান তিনি, মিরপুরে সেই ম্যাচে তিনি ১০১ রানে নট আউট থেকে ইনিংস ডিক্লেয়ার করেন।
তৃতীয় শতক – ক্রিকেট দেবতা রিয়াদকে তৃতীয় শতকের জন্য অপেক্ষা করতে দেন নি। ঠিক তার পরের ম্যাচে ২০১৮ সালে ঘরের মাঠে মিরপুরে ওয়েস্টইন্ডিজের বিপক্ষে ১৩৫ রান করেন।
চতুর্থ শতক – মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ তার চতুর্থ এবং সর্বশেষ শতক হাঁকান ২০১৯ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে স্যাডন পার্কে, ওই ম্যাচে তিনি ১৪৬ রান করেন, যেটা এখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে ওনার ইনিংসসেরা রান।

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ক্রিকেট বিশ্বে একজন অতি পরিচিত নাম, বাংলাদেশ দলের হয়ে তিনি ১৩বছর সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন। গত ৭-৮ বছর ধরে নিয়মিত বাংলাদেশ দলের হয়ে পারফর্ম করে আসছেন। শেষ দশ বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট যত হাড্ডাহাড্ডির ম্যাচ খেলেছে তার প্রায় সবকটিতেই ছিলেন রিয়াদ। কখনো ছিলেন নায়কের বেশে কিংবা কখনো ট্র্যাজিক হিরোর বেশে। কখনো দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন জয়ের বন্দরে , আর কখনো পথ হারা নাবিকের মতো দলকে রেখে এসেছিলেন বিপদে। ২০১১ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের নায়ক যে তিনিই ছিলেন, আবার ২০১৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১রানের পরাজয়ের খলনায়ক যে তিনি। এরকম অনেক উদাহরণ আছে তার। আশা করছি ভবিষ্যতে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

 299 total views,  1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *