ভ্যালেন্টাইনরাও ক্রিকেট খেলতেন !! ভ্যালেন্টাইন মানে ভালোবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক?
ভ্যালেন্টাইনরাও ক্রিকেট খেলতেন !! ভ্যালেন্টাইন মানে ভালোবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক?

ভ্যালেন্টাইনরাও ক্রিকেট খেলতেন !! ভালবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক?

ভ্যালেন্টাইন মানে ভালবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক?

শিরোনামটি দেখে পাঠকদের অনেকে হেসে উঠতে পারেন! অনেকে আবার বলে উঠবেন যে ভ্যালেন্টাইন শব্দের অর্থ ভালবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক, ক্রিকেটে তো এক পক্ষ অপর পক্ষের প্রতি ভালবাসা দেখাতে মাঠে নামে না, নামে জেতার জন্য ইত্যাদি, ইত্যাদি…। পাঠকদের এসব ভাবনা-চিন্তা কিয়দাংশে সত্য তবে ভ্যালেন্টাইন শব্দের সাথে ক্রিকেট এর ভগাংশ আকারে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে! সেটা কোন প্রকার কাঠামোগত দিক দিয়ে নয়, নামগত দিক দিয়ে।

এখন পর্যন্ত ৩ জন পুরুষ ক্রিকেটার তাদের নিজ দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন যাদের নামের একটি অংশ ছিল “ভ্যালেন্টাইন”। ভ্যালেন্টাইন নামধারী প্রথম ক্রিকেটার ছিলেন ইংরেজ খেলোয়াড়, ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন। দ্বিতীয়জন হলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর আল্ফ ভ্যালেন্টাইন আর তৃতীয় ব্যক্তির নাম হল ডেভিড ভ্যালেন্টাইন লরেন্স। লরেন্সও ব্রায়ান এর মত ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন। নিম্নে এ তিন ক্রিকেটার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরার প্রয়াস করা হল:

  • ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন(ইংল্যান্ড)
    পুরো নাম ব্রায়ান হার্বাট ভ্যালেন্টাইন। ১৯০৮ সালের ১৭ই জানুয়ারি ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরের ব্ল্যাকহিদে জন্ম। ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন নামে ক্রিকেটে যার পদচারণা শুরু। রেপটন স্কুল ও ক্যামব্রিজের প্যামব্রোক কলেজে পড়াশোনা করেন ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন। ছোটকাল থেকে সহজাত প্রকৃতির ক্রীড়াবিদ ছিলেন ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন। অধিকাংশ খেলাতেই তার দক্ষতা ছিল। রেপটনে থাকাকালে এইচ. ডব্লিউ. অস্টিনের সাথে জুটি গড়ে পাবলিক স্কুল লন টেনিসের শিরোপা লাভ করেন। ক্যামব্রিজের পক্ষে ফুটবল খেলায় ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় খেলেছিলেন বেশকিছুদিন। এছাড়া তিনি গল্ফ খেলায়ও অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। এতসত খেলায় দক্ষতা থাকার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার টানে তিনি ক্রিকেটকেই বেছে নেন। রেপটন একাদশ এর হয়ে তিন বছর ক্রিকেট খেলেন ব্রায়ান। ১৯২৫ সালে অনন্যসুন্দর পারফরম্যান্স করেও শেষের বছরটিতে এসে ইনজুরির কবলে পড়ে ক্রিকেট থেকে সাময়িক বিরতিতে যেতে হয়েছিল ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইনকে।

১৯২৮ ও ১৯২৯ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের হয়ে বেশ দ্যুতি ছড়াতে সক্ষম হন তিনি। কেন্টে ক্লাব দীর্ঘদিনের খেলোয়াড়ী জীবন অতিবাহিত করেন। ১৯২৭ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত কাউন্টি দল কেন্ট এর হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেন তিনি। আক্রমণাত্মকভঙ্গিতে ব্যাটিং এর জন্য তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। জনশ্রুতি আছে ক্রিকেট খেলাকালীন সময়ে যে কোন পর্যায়ের ক্রিকেটে ঘন্টাপ্রতি প্রায় ৫০ রান তুলতে পারতেন ব্রায়ান। ব্রায়ান টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি(১৩৬ রান)করা ৭ম ইংলিশ ব্যাটসম্যান। ১৯৩৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে মুম্বাই স্টেডিয়ামে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ৩ ঘন্টার কম সময়ে ক্রিজে থেকে নিজের অভিষেক টেস্টে ১৬তম ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেকে চোখ ধাঁধানো সেঞ্চুরির কীর্তি গড়েন ব্রায়ান। ঐ সিরিজে ২ টেস্টে মোট ১৭৯ রান করেছিলেন ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেন। অবাক করার বিষয় হল, এই ৬ বছরে মাত্র দুটি টেস্ট সিরিজসহ ৭টি টেস্ট খেলতে পেরেছিলেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪৫.৩৮ গড়ে রান তুলেছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সফরের দ্বিতীয় টেস্টে দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় নিয়ে ১১২ রান তুলেছিলেন ব্রায়ান। ঐ সফরে ৪৫.৩৮ গড়ে রান করেছিলেন তিনি। মাত্র সাত টেস্টে অংশগ্রহণ করলেও তার ব্যাটিং গড় ছিল বেশ ঈর্ষনীয়। নয় ইনিংসে ব্যাট করে ৬৪.৮৫ গড়। সাথে দুইটি সেঞ্চুরি ও একটি হাফ সেঞ্চুরি। তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সাথে ১ম শ্রেণীর ক্যারিয়ারকে তুলনা করলে খানিক আশ্চর্য হতে হয়। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ব্যাটিং গড় মাত্র ৩০.১৫ যা টেস্টের তুলনায় দ্বিগুণের চেয়েও কম। ৩৯৯টি প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচে ১৮,৩০৬ রানের মধ্যে ৩৫টি শতক ও ৯০টি অর্ধ-শতকের ইনিংস রয়েছে ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন এর। ব্যাটিং এর পাশাপাশি ফিল্ডিংয়ে বিশেষ করে কভার অঞ্চলে বেশ এনার্জেটিক ভঙ্গি দেখাতেন তিনি।

৬ বছরে ৬৪+ গড় নিয়ে মাত্র ৭টি টেস্ট এর মাঝে ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন এর টেস্ট ক্যারিয়ার থমকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন ব্রায়ান। রয়্যাল ওয়েস্ট কেন্ট রেজিম্যান্টের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে দক্ষতার সাথে যুদ্ধকার্য প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ মিলিটারি ক্রস পদকে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধকরা অবস্থায় মারাত্মক আঘাত পান তিনি, তা সত্ত্বেও যুদ্ধশেষে পুণরায় ক্রিকেটের জগতে ফিরে আসেন। কিন্তু বিধি বাম হয়ে যাওয়ায় টেস্ট ক্রিকেটকে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাতাতে পারেননি ব্রায়ান। ১৯৩৯ সালের ১৪ই মার্চ তিনি শেষ বারের মত ইংল্যান্ডের সাদা জার্সি গায়ে চড়িয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলেন।

ক্রিকেট থেকে অবসর পরবর্তীকালে ভ্যালেন্টাইন ১৯৬৭ সালে কেন্ট কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কয়েক বছর ঐ ক্লাবের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ তারিখে ৭৫ বছর বয়সে কেন্টের অটফোর্ড এলাকায় ব্রায়ান ভ্যালেন্টাইন এর দেহাবসান ঘটে। তার বড় বোন ক্যারল ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ড নারী দলের হয়ে ১টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন যা ছিল নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে ১ম আয়োজিত টেস্ট ম্যাচ। ম্যাচটি হয়েছিল ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে, প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচটির প্রথম ইনিংসে ক্যারল ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে অজি অফ-স্পিনার অ্যানি পামের এর বলে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে যান। ১ম ইনিংসে বল করার সুযোগ না পেলেও ক্যারল ২য় ইনিংসে বোলিং এর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সে ইনিংসে ৫ ওভারের বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি তার বোলিং স্পেল। ৫ ওভারের বোলিং স্প্যালে ক্যারল ৯ রানে ১টি উইকেট পেয়েছিলেন। ম্যাচটি ইংল্যান্ড নারী দল ৯ উইকেটে জিতে নিতে সমর্থ হয়েছিল। এই ম্যাচটির পর ক্যারল ভ্যালেন্টাইন আর কখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে পারেননি।

  • আল্ফ ভ্যালেন্টাইন(ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
    পুরো নাম আলফ্রেড লুইস আল্ফ ভ্যালেন্টাইন। বাঁ হাতি স্পিনার। ১৯৩০ সালের ২৮শে এপ্রিল জামাইকার কিংস্টনে জন্ম। ক্রিকেটবিশ্বে আল্ফ ভ্যালেন্টাইন নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ড সফরে ৫ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সে সফরে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় ২০ বছর বয়সী আল্ফ ভ্যালেন্টাইন এবং ২১ বছর বয়সী আরেক স্পিনার সনি রামদিন এর। ঐ সফরে বিখ্যাত ‘থ্রী ডব্লিউ’ খ্যাত ক্লাইড ওয়ালকট, এভারটন উইকস ও ফ্রাঙ্ক ওরেলের মত বিখ্যাত ব্যাটসম্যান থাকা স্বত্ত্বেও কার্যকরী বোলারের অভাব ছিল। ঘরোয়া প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে মাত্র দুই খেলায় অংশ নিয়ে ৯৫ গড়ে দুই উইকেট পেলেও অধিনায়ক জন গডার্ডের সুপারিশক্রমে সফরের জন্য অনেকটা আকস্মিকভাবে মনোনিত হন আল্ফ। আল্ফ এর দলে সুযোগ পাওয়া যে নিছক কোন দুর্ঘটনা ছিল না সেটা ল্যাঙ্কাশায়রের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই প্রমাণ করতে থাকেন তিনি। সে ম্যাচে দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৮/২৬ ও ৫/৪১ পেয়েছিলেন আল্ফ। ফলে উইন্ডিজ ইনিংস ও ২২০ রানের ব্যবধানে প্রস্তুতি ম্যাচটি জিতে নিয়েছিল।

এর কিছুদিন পর আসে আল্ফ এর সে ঐতিহাসিক ৮ জুন। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘটে টেস্ট অভিষেক। বল হাতে ইংল্যান্ডের ১ম ইনিংসে পতন হওয়া প্রথম ৮ উইকেটের সবগুলোই তিনি নিজের ঝুলিতে ভরে নেন তন্মধ্যে মধ্যাহ্ন বিরতির পূর্বেই ৫ উইকেট শিকার করেন। ঐ ইনিংসে ১০৪ রানের বিনিময়ে ৮ উইকেট এবং ২য় ইনিংসে ১০০ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেটসহ খেলায় ২০৪ রানে মোট ১১ উইকেট পান। ঐ টেস্ট ম্যাচটিতে মোট ১০৬ ওভার বল করেছিলেন আল্ফ। আল্ফ এর ৮ উইকেট প্রাপ্তি টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অভিষেকের প্রথম ইনিংসে ৮ উইকেট লাভ এর ১ম ঘটনা যা জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত মাত্র তিনবার ঘটেছে। তার হৃদয় নিঙরানো এই পারফরম্যান্স স্বত্ত্বেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটি হেরে যায়। ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের ১ম ইনিংসে পাওয়া আল্ফ এর ৮ উইকেট এখন পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের হয়ে অভিষেক টেস্ট ইনিংসে সর্বোচ্চ উইকেটপ্রাপ্তির রেকর্ড[দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছেন যথাক্রমে ড্যারেন স্যামি(৭/৬৬) ও ফ্রাংকলিন রোজ(৬/১০০)]।

আল্ফ এর অভিষেক সিরিজের প্রথম টেস্ট হেরে গেলেও লর্ডসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বেশ দাপটের সাথে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় এবং ৩২৬ রানে টেস্ট ম্যাচটি জিতে প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের সুমধুর স্বাদ নেয়। লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়ালকটের অপরাজিত ১৬৮ রান এবং রামদিন-ভ্যালেন্টাইন এর জাদুকরী ঘূর্ণি উইন্ডিজকে জয় পেতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। ঘূর্ণি ভ্যালকি দেখিয়ে ভ্যালেন্টাইন ঐ টেস্টে ১২৭ রান খরচায় ৭ এবং রামদিন ১৫২ রান খরচায় ১১ উইকেট পেয়েছিলেন। ঐ সিরিজের তৃতীয় ও চতুর্থ টেস্টে জয়ী হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ পর্যন্ত প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় করে। আল্ফ তৃতীয় টেস্টে ৫ ও চতুর্থ টেস্টে ১০ উইকেট নেন। তৃতীয় টেস্টের এক ইনিংসে ৯২ ওভার বোলিং করে তৎকালীন সময়ে টেস্ট ফরম্যাটে এক অনন্য রেকর্ড গড়েন আল্ফ। সতীর্থ স্পিনার সনি রামদিনকে সঙ্গে নিয়ে আল্ফ ভ্যালেন্টাইন ১৯৫০ এর তার সেই বিখ্যাত অভিষেক টেস্ট সিরিজে ইংরেজ ব্যাটসম্যানদের নাকানি চুবানি খাইয়ে দু’জন মিলে ৫৯ উইকেট দখল করেছিলেন যা কোন দলের দু’জন স্পিনারের পক্ষে যে কোন টেস্ট সিরিজে নেওয়া সর্বোচ্চ উইকেট। এই রেকর্ডটি এখনও অবধি অক্ষত আছে!

ভ্যালেন্টাইনরাও ক্রিকেট খেলতেন !! ভ্যালেন্টাইন মানে ভালোবাসা, এর সাথে ক্রিকেটের কিসের সম্পর্ক?

ছবিঃ সংগৃহীত

আল্ফ ১৯৫১/৫২ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে পাঁচ টেস্টে ২৪ উইকেট তোলে আবার ক্রিকেটপাড়ায় হৈচৈ তোলেন। এরপর ১৯৫৩ সালে সফরকারী ভারতের বিপক্ষে ৫ টেস্টের সিরিজে ২৮ উইকেট পান। ১৯৫৪ সালে প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বোলার হিসেবে মাত্র ১৯ টেস্টে শততম উইকেট এর মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী ১৭ টেস্টে তিনি মাত্র ৩৯ উইকেট পান। টেস্টে শততম উইকেট প্রাপ্তির পরবর্তী বছরগুলোতে উইকেট উৎসবে আগের মত মেতে উঠতে না পারলেও ওভারপ্রতি রান খরচে বেশ কৃপণতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। ঐ সময়টাতে প্রতি ওভারে ২.০৬ গড়ে রান দিয়েছিলেন তিনি।

টেস্ট অভিষেকে রাজকীয়ভাবে আবির্ভাব হলেও তিনি তার রাজকীয়তা ধারাবাহিকভাবে ধরতে রাখতে পারেননি। ১৯৫৭ সালের ইংল্যান্ড সফরটি তার জন্য ব্যর্থতার ষোলকলায় পূর্ণ ছিল যা কার্যত তার ক্যারিয়ারকে আলোর উজ্জ্বলতা বৃহৎ পরিসরে দেখতে দেয়নি। ১৯৬২ সালের ১৮ই এপ্রিল ভারতের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর হয়ে আল্ফ ভ্যালেন্টাইন সর্বশেষবারের মত টেস্ট ম্যাচ খেলেন। ১৯৫১ সালে ভ্যালেন্টাইনকে উইজডেন কর্তৃক অন্যতম বর্ষসেরা ক্রিকেটার মনোনীত করা হয়। তার সাথে অন্য চারজন বর্ষসেরা ক্রিকেটার ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সনি রামাদিন, এভারটন উইকস, ফ্রাঙ্ক ওরেল এবং ইংল্যান্ডের গডফ্রে ইভান্স।

খেলোয়াড়ী জীবন থেকে অবসর নেয়ার পর জ্যামাইকার জাতীয় দলকে কোচিং করান তিনি। ২০০৪ সালে ৭৪ বছর বয়সে ফ্লোরিডার অর্ল্যান্ডোতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান আল্ফ ভ্যালেন্টাইন। উইজডেন কর্তৃক বর্ষসেরার খেতাব পাওয়া একজন বাঁ হাতি স্পিনার এর টেস্ট ক্যারিয়ার ৩৬ টেস্টে ৩০.৩২ গড়ে ১৩৯ উইকেটে এসে থেমে যাওয়া ভ্যালেন্টাইন প্রেমীদের জন্য একটি অন্যতম আক্ষেপের বিষয় হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে!

  • ডেভিড লরেন্স(ইংল্যান্ড)
    পুরো নাম ডেভিড ভ্যালেন্টাইন লরেন্স। ১৯৬৪ সালের ২৮শে জানুয়ারি ইংল্যান্ডের গ্লৌচেষ্টাশায়ারে এক জামাইকান দম্পতির ঘরে জন্ম। ডেভিড লরেন্স নামে ক্রিকেটে পরিচিত ছিলেন। পরিবার ও বন্ধু মহলে তাকে সবাই ” সিড” নামে ডাকত। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তার বলে প্রচণ্ড গতি থাকলেও সঠিক জায়গায় বল ফেলতে পারতেন না তিনি। তাই ১৯৮৮ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১ ম্যাচের টেস্ট ম্যাচে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটলেও দলে ছিলেন না নিয়মিত। তবে ১৯৯১ সালে গতির পাশাপাশি বোলিংয়েও নিয়ন্ত্রণ আনতে সক্ষম হন ভ্যালেন্টাইন লরেন্স। ৯১ তে ওভাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তৎকালীন মাইটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজের ৫ম ম্যাচের একটি ইনিংসে তার ১০৬ রানে পাওয়া ৫ উইকেট ইংল্যান্ডকে সিরিজে সমতা ফেরাতে সহায়তা করেছিল যেটি আজ অবধি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বেস্ট বোলিং ফিগার হিসেবে রেকর্ড বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তার ঐ ইনিংসে পাওয়া ৫টি উইকেটের ধরণ যারা স্বচক্ষে মাঠে বসে দেখেছেন তারা তখন সন্দেহাতীতভাবে বলেছিলেন যে ইংল্যান্ড বোধহয় পরবর্তী এক দশকের জন্য কাঙ্খিত পেস বোলার পেয়ে গেছে!

ক্রিকেট মাঠে সবকিছু যখন লরেন্স এর পক্ষে যাওয়া করেছিল ঠিক সেই মূহুর্তেই তার ক্যারিয়ারে কালো মেঘ হয়ে দেখা দেয় ইনজুরি নামক দানব। ১৯৯২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে অনুষ্ঠিত একটি টেস্টে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে নিজের তৃতীয় ওভার করার সময় হঠাৎ ই পড়ে যান ভ্যালেন্টাইন লরেন্স। ভেঙ্গে যায় তার হাঁটুর হাড়। কার্যত সেই হাঁটুর ইনজুরি লরেন্সকে পরবর্তীতে আর কখনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্বাভাবিকভাবে ফিরতে দেয়নি। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যায় লরেন্স নামক একটি পেস বোলিং সম্ভাবনার!

এরপর অবশ্য ১৯৯৭ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। তবে সেখানে বেশি একটা সুবিধা করতে পারেননি তিনি। ৯৭ সালে ক্রিকেট ছাড়ার পর ক্রীড়াপ্রেমী লরেন্স তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সহয়তায় একটি স্থানীয় বডি-বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর মধ্য দিয়ে সেটিকেই তার পরবর্তী স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০১৪ সালে ৪০+ বয়সে এসে বডি-বিল্ডিংয়ে টানা ৩ বার ‘বেস্ট ইন দ্যা ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড’ নির্বাচিত হন ভ্যালেন্টাইন লরেন্স। ক্রীড়াজগতের বাইরে ব্রিস্টলের একটি নাইটক্লাব রয়েছে লরেন্স এর। ক্রিকেট থেকে বডি-বিল্ডিং পেশায় আসা একমাত্র ক্রিকেটার তিনি। তার ছেলে বোস্টি লরেন্স বাবার মত ক্রিকেট কিংবা বডি-বিল্ডিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি। বোস্টি রাগবি খেলাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ইনজুরির বশবর্তী হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৮৫ ম্যাচে ৩২.১ গড়ে ৫১৫টি উইকেট কিংবা ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ৫ টেস্টে ১৮টি উইকেট এর পাশাপাশি একটি মাত্র ওয়ানডে খেলে ৬৭ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট শিকার করা ডেভিড ভ্যালেন্টাইন লরেন্স নামক সম্ভাবনার ক্রিকেটীয় ইতি যদি না ঘটত তাহলে পেস বোলারদের জগতে তিনিই হয়ত হয়ে উঠতে পারতেন একজন সত্যিকারের ভ্যালেন্টাইন!

 115 total views,  1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *