ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া এবং একটি টাই টেস্টের গল্পকথা
ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া

ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া এবং একটি টাই টেস্টের গল্পকথা

ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ

“you weak Victorian , i want a tough Australian out there ” ক্যাপ্টেন এলান বর্ডারের কাছে এই ধরণের কথা টি যখন ডিন জোন্স শুনলেন তখন তিনি ১৭০ রানে ক্রিজে ব্যাট করছিলেন । ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার কাছাকাছি চেন্নাইয়ের স্টেডিয়াম তখন এক জলন্ত উনুন । যেন ডিনো সেই উনুনের মধ্যে পুরোপুরি নিজেকে সপে দিয়েছেন । প্রতি ওভার শেষেই ডিনোর অবস্থা ক্রমান্বয়েখারাপের দিকে যাচ্ছিল । বর্ডার বুঝতে পারছিলেন একটু পরই হয়তো ডিনো বলবে যে আমি এখন রিটায়ার করব । ও , হ্যাঁ জোন্স কিন্তু মাঠে কয়েক বার বমিও করে  ফেলেছিল। শরীর যে তাকে আর সায় দিচ্ছে না ! দলে তখন ডিন জোন্স তিন নম্বরে কেবলই থিতু হওয়ার চেষ্টারত । এমন অবস্থায় ক্যাপ্টেনের হুমকি! ডিনোর মনের মধ্যে এক জেদ চেপে বসলো । না , মাঠ ত্যাগ করা যাবে না । ক্যাপ্টেনের মনের কথাটাও কিন্তু তাই ছিল , ডিনোর ভিতর জেদ তৈরি করা , যাতে তিনি শতভাগ সফল।
বলছিলাম ভারত    অস্ট্রেলিয়া এর মধ্যকার মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত ৮৬/৮৭ সনের টেস্টের কথা । টসে জিতে বর্ডার মরা পিচে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নেন । ডেভিড বুনের সাথে জোন্সের দ্বিতীয় উইকেটে ১৫৮ রানের একটা পার্টনারশিপ গড়ে তুলেন । প্রথম দিনের একেবারে শেষ মুহূর্তে বুন যখন আউট হয়ে যান তখন দলের রান ২০৬ । নাইট ওয়াচম্যান হিসেবে নামানো হল স্পিনার রে ব্রাইটকে । সুন্দর ভাবেই জোন্স -ব্রাইট মিলে পার করে দিলেন দিনের বাকি ওভার গুলো । ব্রাইট নামটা মনে রাখতে পারেন এই লেখার শেষ অবধি !
ওদিকে চেন্নাইয়ের গরম ভারত শিবিরেও হানা দিবে না , তা কি হয় । নিয়মিত উইকেট রক্ষক কিরন মোরে অতিরিক্ত গরম আর ফুড পয়জনিং এ আক্রান্ত হয়ে খেলা শুরুর ৫০ মিনিটের মধ্যেই মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হয় । দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ২১১/২ , যেখানে জোন্সের অপরাজিত ৫৬ রানের পাশে বুনের ১২২ রান । আর কিছুক্ষণ থাকতে পারলে বুনের নামের পাশেও অপরাজিত কথাটি লেখা থাকতে পারতো !
দ্বিতীয় দিনে জোন্স আর রে ব্রাইট জুটি যখন ভেঙ্গে গেল , তখন দলের রান ২৮২ । অধিনায়ক বর্ডার মাঠে এসে জোন্সের সাথে জুটি বাধলেন । জোন্স তখন সপ্রিতভ । চার ছয় আর দারুন সব শটে নিজের ইনিংসকে নিয়ে যাচ্ছিলেন দারুন উচ্চতায় । ছোট একটা তথ্য যোগ করি , বর্ডার তার প্রথম রান টি করতে সময় নিয়ে ছিলেন ৪৪ মিনিট ! ভাবা যায় ? অপরদিকে জোন্সের নিজস্ব ১২০ রানের পর থেকেই তীব্র গরমে বমি বমি ভাব , পেশীতে টান আর অবশ অবশ ভাব চলে আসছিল । গরমটা জোন্সের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছিল । কিন্তু জোন্স তার সকল শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের বোলিং মোকাবিলার পাশাপাশি নিজের শরীরের বিরুদ্ধেও যেন যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন।
ভারত এর মাটিতে কোন অস্ট্রেলিয়ানের প্রথম দ্বিশতক গড়ার কীর্তির পথে তিনি । কিন্ত শরীর যে আর সায় দিচ্ছে না । পিচের উপরই করে দিলেন বমি , ট্রাউজার ভিজে গেল প্রস্রাবে । কিন্তু তিনি দ্বিশতক না করে থামলেন না । ক্যাপ্টেনের সাথে ১৭৮ রানের জুটি গড়ে যখন তিনি আউট হয়ে গেলেন তখন তার নামের পাশে ৩৩০ বলে ঝকঝকে ২১০ রান লেখাটা ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছিল । ভারত এর মাটিতে তখন পর্যন্ত যে ঐটাই সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত স্কোর ছিল । এখনও কি পরিবর্তন হয়েছে সেই রেকর্ডের ? উত্তর টা না হওয়াই স্বাভাবিক ! ৫০২ মিনিটের এই ইনিংস শেষে জোন্সকে সঙ্গত কারনেই সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । এই একটি ইনিংস খেলতে যেয়ে তিনি ওজন হারিয়েছিলেন প্রায় ৮ কেজি !
তৃতীয় দিনে মাত্র আধ ঘণ্টা ব্যাট করেই বর্ডার বুঝে যান এনাফ ইজ এনাফ।ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দিলেন ৫৭৪/৭ এ ।
সুনিল গাভাস্কার যখন শ্রীকান্ত কে নিয়ে ভারতের ইনিংস ওপেন করলেন তখন সবার আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে কিন্তু সুনিলই ছিলেন । কারন এই টেস্ট ম্যাচেই তিনি একটি রেকর্ড গড়লেন , যা আর কারো পক্ষে কখনও ভাঙ্গা সম্ভব না ! হ্যাঁ, সর্ব প্রথম টানা ১০০ টি টেস্ট খেলার রেকর্ডের কীর্তি ।
ঐ ম্যাচের উপর ডকুমেন্টারি দেখতে পারেনঃ
অজি স্পিনার ম্যাথিউজের কারনে গাভাস্কার সুবিধা করতে পারলেন না ।কট এন্ড বোল্ড হয়ে গেলেন মাত্র ৮ রানে । ভারতের প্রথম সারির সাত ব্যাটসম্যানের মধ্যে , ম্যাথিউজের শিকার ৫ টি । দলীয় স্কোর যখন ২৪৫ ,তখনও ভারতের ফলো অন এড়ানোর জন্য প্রয়োজন ১২৯ রান । হাতে মাত্র তিনটি উইকেট ।
ত্রাতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হলেন কপিল দেব ।চেতন শর্মা আর শিবলাল যাদভের সাথে যথাক্রমে ৮৫ আর ৫৭ রানের দুইটি জুটি গড়ে রুখে দিলেন ফলো অন । সেই সাথে নিজে করলেন ১৩৮ বলে ১১৯ রান । ভারত প্রথম ইনিংসে ৩৯৭ রানে অল আউট হয়ে গেলে ,অজিদের লিড দাড়ায় ১৭৭ রান।
ব্যাট করতে নেমে খুব দ্রুত রান সংগ্রহে মনোনিবেশ করে অজিরা । চতুর্থ দিন শেষে তাদের স্কোর দাড়ায় ১৭০ /৫ ।এমন অবস্থায় অনেকটা এগিয়ে থাকা অজিরা জয়ের ঘ্রান পেতে শুরু করে । তাইতো সবাইকে অবাক করে দিয়ে চতুর্থ দিন শেষে অজিদের ১৭০/৫ হয়ে যায় , ১৭০/৫ ডিক্লেয়ারড ।
অর্থাৎ পঞ্চম দিনে ভারতকে জিততে হলে ৩৪৮ রান করতে হবে , আর অজিদের জন্য দরকার ১০ টি উইকেট ।
প্রথম উইকেটে গাভাস্কার -শ্রীকান্ত ৫৫ রানের একটি জুটি গড়ে বুঝিয়ে দিলেন ভারতও জয়ের জন্যই চেষ্টা করবে । দ্বিতীয় উইকেটে গাভাস্কারের সাথে অমরনাথের ১০৩ রানের জুটি ম্যাচে খুব ভালভাবেই ভারতকে নিয়ে এসেছিল । টি ব্রেকের আগে ভারতের স্কোর দাড়ায় ১৯৪/২ রান । অর্থাৎ শেষ সেশনে ভারতকে জিততে হলে করতে হবে ৩০ ওভারে ১৫৫ রান । হাতে ৮টি উইকেট।
টি ব্রেকের পর ভারত খুব দ্রুতই সুনিল , আজহার আর কপিলের উইকেট হারিয়ে ফেলে কিছুটা চাপে পরে যায় । হটাৎই ভারতের স্কোর ২০৪/২ থেকে ২৫৩/৫ হয়ে যায় । পণ্ডিত আর শাস্ত্রি জুটি তে পণ্ডিতের ঝড়ো ৩৯ বলে ৩৭ রানের কল্যানে ভারত বার ম্যাচে ফিরে আসে । ২৯১/৬ থেকে ম্যাচ বের করা সম্ভব , এই ধারনায় উৎসাহী হয়ে চেতন শর্মাও মাঠে ধীর স্থির কিন্তু খুবই প্রয়োজনীয় ২৩ রানের একটি কার্যকরী ইনিংস খেলে ফেললেন । ৩৪৮ রানের টার্গেটে , তখন ভারতের দলীয় রান ৩৩১/৬ । অর্থাৎ , ১৭ রান দরকার দিনের শেষ পাঁচটি ওভার থেকে । ক্রিজে তখনও রবি শাস্ত্রী ছিলেন , ম্যাচটা ভারত হারছে না , এইটাই তখন বাস্তবতা ।
ঐ দিকে অজি অধিনায়ক ম্যাচটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে চিন্তিত । বোলাররা প্রতিটি বল করার আগে কিছুটা সময় ইচ্ছাকৃত নষ্ট করছিল । আম্পায়ারের সাথে এই নিয়ে কিছুটা বিবাদেও জড়িয়ে পরেছিলেন অজি অধিনায়ক । তাদের বক্তব্য ছিল তীব্র গরমে কিছুটা সময় নিচ্ছে , যা ইচ্ছাকৃত নয় । দলের সেরা স্পিনারদের একজন ব্রাইট তখন আবার মাঠের বাইরে ।
অতিরিক্ত গরম যে অজি শিবিরকে আঘাত করেই যাচ্ছিল । ব্রাইট মাঠের বাইরে থেকেই অধিনায়ককে বার্তা পাঠাল , প্রয়োজন হলে বল করতে প্রস্তুত তিনি । অধিনায়ক বললেন অবশ্যই দরকার । ব্রাইট বল করতে এসেই একে একে শিকার করে নিলেন চেতন শর্মা ,কিরন মোরে আর যাদভের উইকেট । ভারতের স্কোর দাড়ালো ৩৪৪/৯ । অর্থাৎ , আরও চারটি রান দরকার , আট বল বাকি । ক্রিজে তখন মানিন্দর আর রবি । সবচেয়ে বড় কথা স্ট্রাইকে তখন মানিন্দর । ব্রাইটের , দুটি বল খুব সতর্কতার সাথেই রুখে দিলেন মানিন্দর ।
শেষ ওভারটি করার জন্য অধিনায়কের আস্থা ম্যাথিউজের উপর । যে কিনা তখন দ্বিতীয় ইনিংসে নিজস্ব টানা ৪০ তম ওভার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ভারতীয়দের বেশির ভাগেরই ধারনা ছিল শাস্ত্রী , ম্যথিউজ কে চার্জ করে খেলবে । কিন্তু শাস্ত্রী নিজেই ভেবেছিল অন্য রকম , যদি চার মারতে যেয়ে আউট হয়ে যায় !
প্রথম তিন বলেই তিন রান নিয়ে নিলেন শাস্ত্রী ( দুই আর এক রান) । কিন্তু একটা দারুন ভুল কিংবা অবাক করা জিনিষ ঘটিয়ে ফেললেন । মানিন্দর যে এখন স্ট্রাইকে ! শেষ তিনটি বল খেলার এক অদ্ভুত ছক তৈরি করে দিলেন শাস্ত্রী । প্রথম দুটি বল ব্লক করো , শেষ বলে রানের জন্য দৌড় দাও । শাস্ত্রীর কাছে মনে হচ্ছিল , যেহেতু স্কোর লেভেল তাই অন্তত হারছিনা । কিন্তু মানিন্দর পাঁচ নম্বর বলেই এল বি হয়ে যান । মজার ব্যাপার হল স্টেডিয়ামের দুই পাশে দুই স্কোর বোর্ড দুই ধরণের রেজাল্ট দেখাচ্ছিল । এক জায়গায় ড্র , আর আরেক স্কোর বোর্ডে টাই । খেলোয়াড়েরা কিছুটা কনফিউজ হয়ে গিয়েছিল তখন ! পরে অবশ্য আম্পায়াররা ম্যাচটি টাই হয়েছে বলেই সবাইকে আশ্বস্ত করেছিলেন ।
এই টেস্টটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের দ্বিতীয় টাই টেস্ট । এই টেস্টে এমন অনেক উপাদান আছে যা কখনও ভুলে যাওয়ার নয় । সুনিলের টানা একশটি টেস্ট খেলার রেকর্ড , শাস্ত্রীর ২০০০ রান আর ১০০ উইকেট ক্লাবে যোগদান ,কিংবা ম্যাথিউজের ১০ উইকেট প্রাপ্তি ও পঞ্চম দিনে টানা ৪০ ওভার বল করা কিংবা ব্রাইটের একটা ম্যাচ চেঞ্জিং ওভার সহ সাতটি উইকেট প্রাপ্তি ।সব কিছু ছাপিয়ে ডিনোর ভারতের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে রেকর্ড ২১০ রান এবং শারীরিক ধকল । আসলেই কি ভুলে যাওয়া যায় এমন অবিস্মরণীয় একটি টেস্ট ম্যাচ ?

 175 total views,  1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *