বই রিভিউ ০৪ঃ নির্বাসন || সাদাত হোসাইন || জীবনের চোরাবালির গল্প
নির্বাসন---সাদাত-হোসাইন

বই রিভিউ ০৪ঃ নির্বাসন || সাদাত হোসাইন || জীবনের চোরাবালির গল্প

নির্বাসন বই রিভিউ

“নির্বাসন” নামটাতেই কেমন যেন আত্মত্যাগ, মনের কোণে লুকিয়ে থাকা কিছু যন্ত্রণা কাতর অনুভূতি যুক্ত ভাবার্থ লুকিয়ে থাকে। নির্বাসন কারই বা ভালো লাগে হোক সেটা সেচ্ছায় বা অন্যের ইচ্ছায়। এই উপন্যাসটি নিয়ে এ অবধি মোট পাঁচটি উপন্যাসের সৃষ্টিকারী বর্তমান প্রজন্মের তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন ঠিক যেন সঠিক সময়ে পাঠকের বিশাল চাহিদা টুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। নয়তো পাঠক গল্প পড়ার সময় এত গভীর ভাবে কিভাবে ডুবে থাকেন? যেনো সে নিজেকেই গল্পের কোন চরিত্রের মধ্যে প্রবল ভাবে খুজে পান।

বইয়ের নাম: “নির্বাসন”
বইয়ের ধরন: সমকালীন উপন্যাস
লেখকের নাম: সাদাত হোসাইন
মূল্য : ৫০২ টাকা
প্রকাশনীর নাম: অন্যধারা
প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম: হৃদয় চৌধুরী
বইয়ের প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০১৯

উপন্যাসের শুরুটা হয়েছিলো ডাকাত সর্দার তোরাব আলী লস্করদের জীবনকাল দিয়ে। লোকালয় থেকে বহু দূরে প্রত্যন্ত এক চরে বংশপরম্পরায় তাদের বাস। সাধারণ মানুষের সাথে ডাকাত দলের এই এক সম্পর্ক, সাধারণ মানুষ তাদের পাপী,খুণী,ভয়ঙ্কর ডাকাত বলে জানেন আর ডাকাতরা সাধারণ মানুষদের তাদের জীবিকার উৎস হিসেবে জানেন। ডাকাত দলের কাছে সাধারণ মানুষ দুশমন না হলেও বন্ধু যে নন তা খুব ভালো করেই জানেন তারা। ঠিক এরকমই সাধারণেরা হারিয়ে যায় ডাকাতের ভীরে,ডাকাতরা হারিয়ে যায় সাধারণদের ভীরে।

১৯৮৮ সালের নির্বাচন কালে দেশের পরিস্থতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে নবীগঞ্জের পাটের আড়ত ব্যবসায়ী আজহার খন্দকার তার মেডিকেল পড়ুয়া বড় ছেলে মনসুরকে বাড়ি নিয়ে আসেন। এই আসাই তার মেডিকেল পড়ুয়া জীবনের ইতি ঘটায়, মেনে নিতে হয় ভাগ্যের নির্মম সত্য কে। গোবিন্দপুরে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেলে সেখানে মনসুরের পরিচয় হয় কনার সাথে।দুজনের পরিচয় থেকে প্রেম,বিয়ে,প্রণয়ের এক নিপুণ বর্ণনা লেখক তার যাদুর হাতে সাজিয়ে তুলেছেন, যে জগতে আপনি আপনার নিজেকে কল্পনা করতে বাধ্য।

গল্পের আরেক প্রধান চরিত্র ডাকাত সর্দারের একমাত্র নাতনি জোহরা। যার সাহসিকতা,বুদ্ধিমত্তা আপনাকে গভীর ভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। একের পর এক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে লস্করচরের সকলের মনে সেরা হওয়ার ঘটনা সত্যিই অসাধারণ। সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা এসব বলে কয়ে কেবল ভদ্রপল্লীতেই আসেনা যার একমাত্র উদাহরণ “জোহরা” ডাকাত দলের নবীগঞ্জ আক্রমণ, ডাকাতদের আজহার খন্দকারের সাথে দুশমনি সম্পর্ক তৈরি,মনসুরের লস্করচরে নির্বাসিত জীবন,কনা ও মনসুরের ভালোবাসার সুখের জীবনে কিভাবে ডাকাত সর্দরের নাতনি জোহরার আগমন ঘটে তা জানতে হলে আপনাকে অবশ্যই পড়তে হবে এ বইটি।

বইয়ের যে যে অংশগুলো মনে ধরেছে:

“যে ঘরে নারী নেই,সেই ঘরের চেয়ে মায়াহীন গৃহ আর জগতে নেই।একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন কন্যা একটা ইট-কাঠ-পাথরের কাঠামোকে মুহূর্তেই ঘর বানিয়ে ফেলতে পারে।জীবনের রোজকার ক্লান্তির দিন, যুদ্ধের পথ,অবিরাম ছুটে চলা শেষে সেই ঘরখানায় তাই ফিরে আসতে হয়।একটু আশ্রয়ের জন্য, একটু প্রশান্তির জন্য, একটু মায়াময় স্পর্শের জন্য। ” –পৃষ্ঠা নং-২৭

“ডাকাত সর্দার তোরাব আলী লস্করের কোন রাজনৈতিক দল নেই বলে সে ডাকাইত আর যারা দল করে তারা সব মসজিদের ইমাম সাব? দুই দলের কাম ত একই,ডাকাতি করা। তোরাব আলীর তাও নীতি আছে, কথা মত কাম করলে ঝামেলা নাই,আর এরা ত(সরকারের আমলা কামলা ডাকাত) যখন খাই ওঠে তখনই ভাদ্র মাসের কুত্তা হইয়া যায় কোন ন্যায় নীতির বালাই নাই।” পৃষ্ঠা নং-১৬৮

“আমাদের সবার বুকের ভেতরেই একান্ত নিজের একটা জগৎ থাকে,নিজের একটা মানুষ থাকে।সেই মানুষটার কাছে আমরা শিশু হয়ে যেতে চাই। আমরা চাই সেই মানুষটা আমার খামখেয়ালি বুঝুক।আমার রাগ, অভিমান,ভালোবাসা, দুঃখ,আনন্দ সব বুঝুক।আমি না বলতেই বুঝুক।” পৃষ্ঠা নং-১৫৫

উপন্যাসটিতে যা শিক্ষনীয়:

আমরাদের চোখে সমাজে চোর,ডাকাত একদল পাপী সম্প্রদায়। চোর,ডাকাত ব্যাক্তিগত ভাবে তাদের নিজেদের কি ভাবে?
তারা কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেনা?
হুম, করে!
তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, চুরি করা, ডাকাতি করা তাদের একটা পেশা।তারা শত সঠিক যুক্তি দিবে নিজেদের এই পেশাকে সৎ বলতে।এমনকি আপনি আপনার মহৎ জীবন যাপন করা জগৎ থেকে যখনি তাদের মধ্যে ডুবে যাবেন তখন আপনারো মনে হবে এই পেশার মানুষগুলোকে বাহির থেকে সবাই মন্দ বলে, পাপী বলে তবে এদের জগৎ টাও আর পাঁচটা মানুষের মতই। এরাও কষ্ট পেলে নামাজ পড়ে,ভালোবাসায় ঘর বাঁধে, যেমন টা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও মনসুরের ছোট্ট একটু স্মৃতি পেটে নিয়ে বাকিটা জীবন পারি দিবে লস্করের ডাকাত চরে ছোট থেকে বড় হওয়া “জোহরা” নামের মেয়েটি।

ভালোবাসার এক নিপুণ সম্পর্ক লেখক সাজিয়ে তুলেছেন এখানে। সমাজের কিছু ব্যাক্তিদের আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে ভালবেসে অন্যকে আপন করে নিতে হয়। যেমনটা আজহার খন্দকার ভালবেসে আপন করেছেন দেলোয়ার হোসেনের একমাত্র মেয়ে কনাকে পুত্রবধু সম্পর্কের চাইতেও বড় করে নিজের মেয়ের মত করে। মা মেয়ের ভালবাসার সম্পর্ক, বাবা মেয়ের ভালবাসার সম্পর্ক, স্বামী স্ত্রীর ভালবাসার সম্পর্ক এতটা সুন্দর করে গুছিয়ে এক ভালবাসাময় উপন্যাস উপহার দিয়েছেন লেখক তার পাঠক কে।

এছাড়াও লেখক এমন এক অবস্থানে তার উপন্যাসের ইতি টেনেছেন যে আপনি নিজেই সেই উপন্যাসের যোগ্য ইতি কল্পনা করে নিবেন। জোহরা, মনসুর ও কনার এই অসমাপ্ত উপন্যাসের জীবনচক্র কে অনুধাবন করে নিতে,কল্পনার জগৎ কে নিজের মত করে সাজিয়ে গল্পের পরিনতি রচনা করতে হলে পড়ুন “নির্বাসন”।

 203 total views,  3 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *