রুপকথা নয়, সত্যিঃ বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় || অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ ফাইনাল
বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়

রুপকথা নয়, সত্যিঃ বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় || অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ ফাইনাল

রুপকথা নয়, সত্যিঃ বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়

ফ্লাইটেড ডেলিভারিটা এক পা এগিয়ে এসে মিড উইকেটে আলতো হাতে তুলে দিলেন রকিবুল। এন্ড চেঞ্জ করতে করতেই উল্লাস। সিংগেলটা কমপ্লিট হতেই বদলে গেল অনেক হিসাব নিকাশ। নতুন করে লেখা হলো ইতিহাস। আমাদের ক্রিকেটের কন্টেক্সটে রুপকথা।

ইয়ান বিশপ ট্রেডমার্ক ক্যারিবিয়ান এক্সেন্টে মাইক্রোফোনে ছড়িয়ে দিলেন নতুন ইতিহাস লেখার বাণী, জানিয়ে দিলেন আগামী আন্ডার নাইন্টিন বিশ্বকাপের প্রথম বলটা গড়ানোর আগ পর্যন্ত, কে থাকবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন।

‘বাংলাদেশ হ্যাভ ডান ইট। দে উইল বি ডান্সিং ইন দ্য স্ট্রিট অফ ঢাকা, সিলেট, চিটাগাং… ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাসটিক! আকবাড় আলী হ্যাজ সিন ইট টু দ্য এন্ড। বাংলাদেশ আর দ্য ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন…অফ দি আন্ডার নাইন্টিন’

দেশের ক্রিকেটপাড়া, মিডিয়া, পত্রিকা সবখানেই যুবাদের জয়গান। প্রথম আলো একটা দারুণ হেডলাইন করেছে। অনেকদিন বাদে কোনো একটা নিউজের হেডলাইন এভাবে মনে হিট করেছে।

অবশ্য এর আগে দেশের ক্রিকেট অনেকভাবেই হিট করেছে মনে। এই প্রথম আলোই কত মন ভেঙে দেয়া হেডলাইন করেছে। কত হৃদয়জেতা ম্যাচের সাক্ষী হয়েছি আমরা। শুধু অল্পের জন্য চ্যাম্পিয়ন ট্রফিটা ওঠেনি হাতে। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে হয়েছে…কত কাছে, তবু কত দূরে….

সেই দুরত্বটা এবার ঘুচেছে। কখনো ভাবিনি আমার দেশকে একটা বিশ্বকাপ জিততে দেখব, ট্রফিটা উঁচু করে দেখতে দেখব। স্বপ্ন দেখতাম ঠিকই… কিন্তু স্বপ্ন, সীমাবদ্ধতা আর বাস্তবতার সংঘাতে, প্রাপ্তির খাতায় কিছু এলোমেলো লেখাই জমা হতো। পাতাগুলো ছিড়ে যেত অদৃশ্য চোখের জলে। কালিগুলো লেপ্টে যেত…

কালও অদৃশ্য চোখের জল ঝরেছে ফোটায় ফোটায়, আনন্দে। ‘ অভিমান, আর খেলা দেখবই না, এসব কিছু হইলো?’ নামক কালি দিয়ে লেখা শব্দগুলো স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

ওই একটা সিংগেলে..মিড উইকেটে।

২৪ ঘন্টায় একটা ঘূর্ণন সম্পন্ন করে আমাদের পৃথিবী। ঘূর্ণন শেষ হলে একটা নতুন দিনের শুরু হয়। আড়মোড়া ভাঙে প্রকৃতি। আচ্ছা, আনকোলেকারের সেই ফ্লাইটেড ডেলিভারিটাও তো ঘুরে ঘুরেই রকিবুলের দিকে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্যের আগেও ‘২৪ বলে একটা রান নিলেই হবে’ ছিল সমীকরণ।

বলের ঘূর্ণন শেষ হতে না হতেই তো একটা নতুন দিনের সূচনা হয়ে গেল… পচেফস্ট্রুমে।

সেবার ওয়েস্টার্ন পড়েছেন তো? দূর্গম পথে হ্যাট, বুট, শোল্ডার হোলস্টার আর কোমড়ে বাহারি পিস্তল গুজে, ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন কাউবয়রা। লড়তেন ডুয়েলে..কেউ মরতো, কেউ বাঁচতো।

কাল তো তেমন ডুয়েলই দেখা গেছে। সাক্সেনার সাথে ওই ঘটনার পর, সাকিবের মারা বাউন্সারটা তো কোনো ডেডলি কাউবয়ের পিস্তল থেকে ছোড়া বুলেটের মতোই মারাত্মক ছিল! আর কথার লড়াই? সে চলেছে সমানে।

আর চলেছে স্বপ্নজয়ের একটা মাসট্যাং কিংবা একটা পনিটেইল, অথবা একটা ইউনিকর্ন। কখনো টগবগিয়ে মরুর বুকে ধুলি উড়িয়ে, কখনো দুলকিতালে, কখনো তৃষ্ণার্ত হয়ে।

ঠান্ডা পচেফস্ট্রুমকে গরম করে রেখেছিলেন প্রবাসী বাঙালিরা। আকবরদের একেকটা ডিফেন্স কিংবা, সিংগেল অথবা লিভ; উষ্ণতা ছড়িয়েছে গ্যালারিতে। টুয়েলভথ ম্যান।

ওই যে লম্বামতোন লোকটা। একটা শর্টস পরা, গায়ে প্র‍্যাক্টিস কিট, ক্যাপটা উলটো করে মাথায় দিয়ে, গ্যালারির সামনে গিয়ে ইয়ূর্গেন ক্লপের মতো দর্শকদের জাগিয়ে তুলছিলেন। বুক চাপড় দিচ্ছিলেন, বাঁ পাশে। চিৎকার করছিলেন। আকবর, সাকিব, ইমনদের ‘রিচার্ড’ ভাই।

ধোনির মতো হয়তো ছক্কা মেরে দেশকে বিশ্বকাপ জেতানো হয়নি, তবে একপ্রান্তে ঢাল হাতে ঠিকই দাঁড়িয়ে ছিলেন আকবর। হয়তো দুজনই উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান বলেই এই সাদৃশ্যটা পাচ্ছি, আর ছোট্ট একটা তুলনাও হচ্ছে।

ব্যাট নামের ঢাল দিয়ে ওপাশ থেকে আসা তীর, বল্লম, বর্শার খোঁচা অবলীলায় ঠেকিয়ে গেছেন বুক চিতিয়ে। তবে সুযোগ বুঝে ঠিকই আক্রমণ করেছেন। কখনো খাপছাড়া তরবারি, কখনো ঢাল দিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো, কখনো মাথার খেলায় তাদের পরাস্ত করা।

উইনিং শটটা তার ব্যাট থেকে আসেনি। তাতে কী? মাঠে থেকে দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন…

ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে পচেফস্ট্রুমের মিড উইকেটে, বাইশ গজ নামের ওয়াইল্ড ওয়েস্টে। যেখানে হয়েছে অনেকগুলো ডুয়েল, চলেছে গুলি। খোসাগুলো হয়তো ওখানে নেই, মিশে গেছে ইতিহাসের পাতায়। জায়গা করে নিয়েছে রুপকথায় সবচেয়ে সুন্দর গল্পে। না না! রুপকথা নয়, সত্যি। কারণ ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন।

ওই একটা সিংগেলে…মিড উইকেটে। ওই বলটা ব্যাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে…

 162 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *