তুমি এতো বাস্তব অভিনয় করছো কেন, এভাবে হবে না | একজন ইরফান খান
যেই অভিনেতাকে মনে রাখবে সবাই

ইরফান খানঃ যেই অভিনেতাকে মনে রাখবে সবাই || একজন যোদ্ধা

ইরফান খান – কিছু না বলা কথা

“তুমি এতো বাস্তব অভিনয় করছো কেন, এভাবে হবে না, আরেকটু ড্রামাটিক কিছু লাগবে”
Kasoor ফিল্মে যাকে এটা শুনতে হয়েছিলো, তার ১০-১২ বছর বলিউডে সংগ্রাম করতে হয়েছে, কারণ তখন ছিলো অক্ষয়- সুনীল শেটির সময়। বাণিজ্যিক সিনেমার সেই দুঃসময় যখন এর বাইরে কিছুকে আর্ট ফিল্ম (আমার জন্য বড়দের ফিল্ম) ধরা হতো।
এখনো মনে আছে ২০০১ সালে সদ্য ঢিশুম ঢিশাম আর ৩খানদের বাইরে একটা ফিল্ম দেখলাম, মোহাব্বাতে ফিল্মের চটলেট বয় জিমি শের্গিলের জন্য দেখলাম Haasil। সাথে একটা তরুণী নায়িকা! ১ম দৃশ্যেই দেখি এলোমেলো দেখতে এক লোক ভার্সিটির ক্যাম্পাসে অকস্মাৎ বোমা ফেললো। ধরে পড়ে সে কি অভিনয়, ছাত্রদের মার খাচ্ছে, কিন্তু তারপরেও যা দেখলাম সেটা সচরাচর দেখা যায় না। এলাকাভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির মুভিটায় ইরফান খান একজন রাজনীতিবিদ। আর জিমি সাধারণ ছাত্র। প্রেম করে আরেক ছাত্রীর সাথে। তিমাংশু ধুলিয়া (Paan Singh Tomar, Saheb Bibi Gangster) এর পরিচালক, যিনি Gangs of Wasseypur এ রামাধির সিং হয়েছিলেন, তার লেখনী-পরিচালনায় রোম্যান্টিক ক্রাইম ড্রামা ফিল্মটা ভালো লাগার মূল কারণ ওই ইরফান খান। কিন্তু নেতিবাচক অভিনয়।
যার জন্য জী সিনে অ্যাওয়ার্ডস, ফিল্মফেয়ারে সেরা নেতিবাচক চরিত্রের পুরষ্কারও জুটলো। ওই বছরই এসেছিলো আরেক নামকরা সিনেমা আর ভিশাল ভরদ্বাজের মতো পরিচালকের। Maqbool! এবার টাবু, ওমপুরি, নাসিরুদ্দিন শাহ্‌, পঙ্কজ কাপুরের মতো অভিনেতার সাথে। শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বানানো ফিল্মটি সমালোচকদের মাঝে দারুণ প্রশংসা পেলেও বাণিজ্যিক ঘরানায় পৌঁছায় নি। সেখানে ম্যাকবেথের চরিত্রে ছিলেন ইরফান। আবারো দুর্দান্ত, তবে পুরষ্কার গেলো পঙ্কজ কাপুরের কাছে
তদ্দিনে ইরফান বলিউডে নিয়মিত হলেও আবার সেধরণের নজরকাড়া মুভি হচ্ছিলো না, তবু ছোটমোটো বাণিজ্যিক সিনেমায় একটা রোল পেলেও ফাটিয়ে দিতেন, যে কারণে মহেশ ভাটের Rog দেখে ফেলেছিলাম। এক মৃত তরুণীর মার্ডারে তদন্ত করতে গিয়ে ইনসোমনিয়া রোগে ভোগা গোয়েন্দা তার প্রেমে পড়ে যায়। এই সাধারণ মহেশ ভাটিয়ো সিনেমাটাও ইরফান মূল চরিত্রে থাকায় গিলেছিলাম। এমন চরিত্র তখন কে করতো বলেন? তাই হয়তো চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলো। গান ভালো হলেও ইমরান হাশমি নেই, কেউ কেন দেখবে মুভিটা?
তার ঠিক পরের বছর ২০০৬ এ আসলো আর্ট ফিল্মের জন্য সুপরিচিত, পোলাপানের কামসুত্র মুভির পরিচালক মিরা নায়ারের The Namesake ফক্সের প্রযোজনায় ইংরেজি-বাংলা ভাষার এই যৌথ ফিল্মটি দেখার মূল কারণ ছিলো মনে হয় ওই ইরফান খানই আর তার স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করা টাবু। ততদিনে খানদের বাইরেও ভালো ফিল্ম দেখা শিখে গেছি। ইয়ে মেরা দিওয়ানাপান গানটা খুব বাজাতাম। ড্রামা ধাঁচের ওই ফিল্মে নায়কের বাবার চরিত্রে ইরফান শুধু তরুণ অভিনয়ই করেন নি, বাবা হয়ে পুরা ফিল্মে ন্যারেশান দিতেন। তার অসামান্য সংলাপ বলার ঢং, যে কারণে ফুটপাথ, চারাসের মতো বাজে ফিল্মও দেখেছি, সেটা এবার একেবারে ভেতরে স্পর্শ করলো। ওই বছর আর কি ফিল্ম বের হয়েছিলো মনে নেই, কিন্তু The Namesake এর ডিভিডি কিনেছিলাম রাইফেল স্কয়ার থেকে।
Best Seduction নামক অ্যাওয়ার্ডও জিতেছিলো মুভিটা, অ্যালিয়েন্স অফ ওমেন ফিল্ম জার্নালিস্ট নামক নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির ওই পুরষ্কার ক্যাটাগরিতে The Atonement ফিল্মটিও মনোনীত হয়েছিলো, জেমস ম্যাকাভয় আর কেইরা নাইটলির প্রেমের দৃশ্যটি হেরেছিলো টাবু আর ইরফানের প্রেমের দৃশ্যের কাছে! ..)
২০০৭, ২০০৮ পরপর দুই বছর Life in a Metro আর Slumdog millionaire এর মতো ফিল্ম, ১মবারের মতো একটা মানসম্পন্ন বাণিজ্যিক ছবির জন্য ভুঁড়ি ভুড়ি পুরষ্কার জুটলো ইরফানের ঝুলিতে, হোক সেটা পার্শ্ব চরিত্র। কেকে মেনন, কঙ্গনা রানাওয়াত, কঙ্কনা সেনের মতো তারকার মধ্য থেকে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। একি বছর মাদারি, দৃশ্যম, ফোর্সের পরিচালকের Mumbai Mere Jaan করলেন। আরেকটি ভালো সিনেমা, কিন্তু ফ্লপ। পরের বছর শাহ্রুখের হোম প্রোডাকশনের বিল্লুতে মূল চরিত্র, কিন্তু কিং খানের উপস্থিতি কম বিধায় পাবলিক হলে আসলো না।
পরের কয়েক বছর নিয়মিত New York, Yeh Saali ZIndagi, Saat khoon maaf এর মতো কিছু ভালো সিনেমা করেছেন। আসলো ২০১২ – এবং Paan Singh Tomar ইরফানের আজ অবধি সেরা অভিনয়, তিমাংশু ধুলিয়ার , তার প্রথম ও একমাত্র জাতীয় পুরষ্কার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি মাত্র ওই একবারই এই সম্মান জুটেছে তার ভাগ্যে। হায় বেঁচে থাকলে হয়তো আরও পেতেন।
পান সিং তোমার যারা দেখেন নি, নেটফ্লিক্সে আছে দেখতে পারেন। ভারতীয় সোনার পদক জেতা দৌড়বিদের গল্প- একটি ক্রাইম ড্রামা। ফারহান আক্তারের জন্য মিলখা সিং দেখেছেন, ইরফানের জন্য এই ফিল্ম দেখেনি এমন মানুষই বেশি-আমি জানি। Netflix যাদের আছে, দেখে নিন।
শুরু হলো ইরফানের সময় সত্যিকার অর্থেই! পরের বছরগুলোয় একের পর এক তার ক্যারিয়ারসেরা সব চলচ্চিত্রঃ-
  • Life of Pi
  • The Lunchbox
  • Haider
  • Piku
  • Talvar
  • Madaari
মাঝে বিদেশী ফিল্ম তো আছেই, তবে একদম সস্তা বাণিজ্যিক মুভি নেই বললেই চলে! এসব ফিল্মে তার চরিত্র এমন যেগুলোতে তার বিকল্প ছিলো না। পরিচালকদের প্রথম পছন্দ তিনি। খানদের পাশাপাশি বড় একটা ভক্তকুল ইরফান আছে শুনলেই আগ্রহী হয়ে দেখতে বসতো মুভি। হয়ে গেলেন আন্ডাররেটেড সুপারস্টার
ভালোমতো ভেবে দেখলাম খানদের ফিল্ম তো এখন আর দেখি না, নায়কদের মধ্যে রাজকুমার রাও, মনোজ বাজপায়ি ছাড়া আর কারো ফিল্মে সেভাবে আগ্রহ পাইনি ওই ইরফান ছাড়া। অনেকে নাওয়াজুদ্দিনকে একি কাতারে ফেলবেন, আমি এখনো তাকে বাকিদের মতো অতোটা Versatile মনে করিনা।
শাহ্রুখের Darr, ইরফানের Haasil, দুটাই নেতিবাচক চরিত্র দিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়া।
  • Hindi Medium
  • Karwaan
  • Qarib Qarib Singlle
এগুলোর মতো আধুনিক বলিউডি কমেডি তো ওর জন্যই দেখা, ওর জন্যই এতো দারুণ! তার যেই ফিল্মগুলো এখনো দেখিনি, বা লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে, সেগুলো খুঁজবো আগামি কয়েকদিন-
  • Qissa (2013)
  • The Song of Scorpions (2017)
  • Puzzle (2018) …………এটা আছে, নামাতে দিয়েছি!
খানদের রাজত্বের ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের একটা ঘরানা তৈরি করে ফেলেছিলেন তিনি। “হার্টকোর অ্যাক্টর বলতো অনেকে। কিন্তু জাত অভিনেতা, শিক্ষিত অভিনেতা, চমৎকার মানুষ- down to earth রসিক। তাই তো বাংলাদেশের “ডুব” ফিল্মেও এসে অভিনয় করে গেছেন।এমন একজন অভিনেতা মাত্র ৫৩ বছর বয়সে চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া যায় না।
ক্যারিয়ারের শীর্ষে ছিলেন, সামনের কয়েক বছর তার এই শূন্যতা পূরণ করবে কারা? তার মতো তো আর কেউ নেই।
He was the real khan!
The Aam Admi,
The true actor Indian film industry may never replace!

 312 total views,  2 views today

One Comment

  1. Morjina Khatun Reply

    আমার বাবা মা দুজনাই অসুস্থ বাবা কোন কাজ কর্ম করতে পার আমি অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হয় আবার ঔষধ কেনতে হয়, যদি আপনারা একটু সহয়তা করেন।তাহলে আমার অনেক উপকার হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *