বই রিভিউ ০২ঃ আমার দেখা নয়াচীন | একটি জাতির জাতীয় জাগরণের গল্প
বই-রিভিউঃ-আমার-দেখা-নয়াচীন--একটি-জাতির-জাতীয়-জাগরণের-গল্প

বই রিভিউ ০২ঃ আমার দেখা নয়াচীন | একটি জাতির জাতীয় জাগরণের গল্প

আমার দেখা নয়াচীন বই রিভিউ

বইটি প্রকাশিত হবার কথা ছিল অনেক আগেই। ২০০০ সালেই স্মৃতিকথা আর নয়াচীন ভ্রমণের ডায়েরি প্রকাশের কাজে হাত দিয়েছেলন লেখকের বড় কন্যা। ২০০৪ এ যখন প্রায় গুছিয়ে এনেছিলেন কাজ তখন তার হাতে আসে পিতার আত্মজীবনীমূলক ডায়েরি। গুরুত্ব বিবেচনায় ভ্রমণ কাহিনী বাদ রেখে কাজ শুরু করেন আত্মজীবনী নিয়ে। ২০১২ তে প্রকাশিত “আসমাপ্ত আত্মজীবনী”র মুখবন্ধে এমন তথ্যই দিয়েছেন লেখক কন্যা শেখ হাসিনা। আত্মজীবনীর পর কারাস্মৃতি নিয়ে “কারাগারের রোজনামচা” প্রকাশের পর লেখকের শততম জন্মবর্ষে মলাটবন্দী হয়ে পাঠকের হাতে এলো “আমার দেখা নয়াচীন”। ভূমিকা লিখেছেন লেখক কন্যা শেখ হাসিনা।

এক নজরেঃ
বই: আমার দেখা নয়াচীন
লেখক: শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৫২ সালে চীনে আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন শেখ মুজিব। জাতীয় রাজনীতির তখন তিনি উদীয়মান নেতা। ৫৪ সালে কারাবন্দি থাকাকালে লিখেছেন সেই ভ্রমণের স্মৃতিকথা। সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ, যাত্রা প্রস্তুতি, রেঙ্গুন – হংকং হয়ে চীনে প্রবেশ, চীনের উষ্ণ অভ্যর্থনা, শান্তি সম্মেলনের খুঁটিনাটি, চীনের স্বাধীনতা দিবস পালন, চীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা কৌশল এবং সম্মেলন পরবর্তী সময়ে ঘুরে দেখা চীন ও চীনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার গল্প আছে বইটিতে। এটা কোন সাহিত্যিকের দেশ ভ্রমণের চমকপ্রদ গল্প নয়। এটা কৌতূহলী রাজনৈতিক নেতার দেশ ভ্রমণ, যাতে ভ্রমণ বৃত্তান্তের হয়ে উঠেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

আমন্ত্রিত হয়ে চীনে গেলেও সদ্যমুক্ত দেশটির কম্যুনিস্ট সরকারের প্রতি খুব একটা আস্থাশীল ছিলেন না শেখ মুজিব। নিজে যাচাই করে দেখতে চেয়েছিলেন কেমন আছে সেখানকার সাধারণ মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষের দোরগোড়ায় হাজির হয়ে জানতে চেষ্টা করেছেন তাদের প্রকৃত অবস্থা। জানতে চেষ্টা করেছিলেন কম্যুনিস্ট সরকারের আমলে ধর্ম পালনের কতোটুকু সুযোগ পাচ্ছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। আস্থা হারাবার কোন কারণই খুঁজে পাননি তিনি। কৃষি, শিল্পকে এগিয়ে নিতে সেখানকার কারিগরি শিক্ষা, আমদানি আয় কমাতে বৈদেশিক পণ্য ব্যবহার বন্ধ এবং দেশের উন্নয়নে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে মুগ্ধ হয়েছেন লেখক। সব থেকে চমক জাগানিয়া বিষয় ছিল মানুষের নৈতিক উন্নতি। সেটা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল কর্মচারীরা ঘুষ নিচ্ছে না, বিক্রেতা পণ্যের অধিক মূল্য নিচ্ছে না এমনকি একটা রিক্সা চালক যাত্রীর কাছে দাবী করছে না এক ইয়েন অতিরিক্ত ভাড়া। এমনকি যখন যাত্রী জানেই না ন্যায্য ভাড়া কতো।

“আমার দেখা নয়াচীন” বইটি একটি জাতির জাতীয় জাগরণের গল্প। ২০০ পৃষ্ঠার বইটির ১২০ পৃষ্ঠাতেই শেষ হয়েছে ভ্রমণ কাহিনী। চীন ভ্রমণের দূর্লভ কিছু ছবি এবং টীকা, নির্ঘন্ট স্থান পেয়েছে বাকি অংশে। সাহিত্যমূল্য বিচারে এটাকে উচ্চ মানের সাহিত্য বলা চলে না। শেখ মুজিব তার নিজস্ব ভাষা-ভঙ্গিতেই বইটি লিখেছেন। আগের বই দুটি পড়া থাকলে পরিচিত এবং প্রাঞ্জল মনে হবে ভাষা। আত্মজীবনীর তুলনায় বিষয়বস্তুর সরলতার কারণে এটাকে তূলনামূলক সহজপাঠ্য মনে হয়েছে। একজন জাতীয় নেতার বই যেহেতু সব ধরনের পাঠকই পড়তে চাইবে সেই বিবেচনায় বইটির মূল্য কম রাখা গেলে ভালো হতো।

“আমার দেখা নয়াচীন” বইটিতে লেখকের চাঞ্চল্য, বিভিন্ন বিষয়ে করা খুনসুটি থেকে যেমন বোঝা যায় বয়সে তিনি ছিলেন যুবক তেমনি তার উৎসুকভাব, তার অনুসন্ধানী আচরণে খুঁজে পাওয়া যাবে একজন ভবিষ্যত প্রাজ্ঞ নেতার বৈশিষ্ট্য। শেখ মুজিব কম্যুনিস্ট সরকারের অনেক কিছুতেই মুগ্ধ হলেও একমত হয়নি তাদের একদলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের উপর। নিতান্ত ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে নয়, একজন উদীয়মান নেতার বয়ানে আজকের উন্নত চীনের উত্থানকালের চিত্র পাওয়া যাবে বইটিতে। ইতিহাস রাজনীতি নিয়ে আগ্রহীদের ভালো লাগার মত বই।

( বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইটির লিখিত মূল্য ৪০০ টাকা)

 79 total views,  2 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *